সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী দিয়ে কিছু তত্ত্বায়ন করছিলো। তারা ছিলো ইয়াঙ্কিদের নব্বই পরবর্তী থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাদের মধ্যে হান্ডিংটন সাহেব এবং তার ক্লাস অব দ্য সিভিলাইজেশ্যন তত্ত্ব মার্কিন সাম্রাজ্যের বেশি কাজে লাগে। দুনিয়ায় ইসলামফোবিয়া তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য দখল, মার্কিনীদের নয়া গেস্টাপো বাহিনী ন্যাটোর উন্মত্ততা বৃদ্ধি, তার জায়নবাদী গুন্ডা প্রজেক্ট ইসরায়েলের শয়তানিকে প্রশ্রয় দেয়া বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত পরবর্তী সময়কে ভয়ঙ্কর এককেন্দ্রিক বর্বরতার ফ্রেমওয়ার্ক ফেলে দেয়। এরপর ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দায় ইয়াঙ্কি আর তার এঙ্গো দোসররা ভালো বিপদে পড়ে। অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার শক্তিমত্তার বাড়বাড়ন্ত আর কিছু ছোট দেশের উত্থান, লাতিন আমেরিকায় কমিউনিস্ট কিউবার নেতৃত্বে বাম উত্থান তাদেরকে আরও ত্রাহি অবস্থায় ফেলে। এসময়ই তারা নিও লিবারেলের ভণ্ডামি ছেড়ে বর্বর পুপলিস্ট ফ্যাসিজমের পথ ধরে। তার পরিণতিতে পৃথিবীর কিছু দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ প্রশস্ত করে।
হান্ডিংটন সাহেবের পাগলা তত্ত্বের প্রোপাগাণ্ডায় ভারতের বৃহত বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় নিয়ে আসে বিজেপিকে। গুজরাটের গণহত্যার কসাই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বকে দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের ক্ষমতায় ধরে রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্র হাসিনা সরকারকে মোদির আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করা হয়। এইভাবে হান্ডিংটনের পাগলা তত্ত্বের দৌড়ানিতে বিধ্বস্ত হচ্ছে ভারত, বাংলাদেশ আর পাকস্তানের মানুষ। ইতিহাসকে পাল্টে দেয়া হচ্ছে। ভারতের গণতন্ত্রের মধ্যে জাতপাতের বিভাজনকে তীব্র করে, আইডেন্টি পলিটিক্সকে শার্প করে ভারতে হিন্দুত্ববাদের নামে পপুলিস্ট রিলিজিয়াস ফ্যাসিজমকে দীর্ঘসময়ের স্টাবালিটিতে নেয়া হচ্ছে।
উপমহাদেশে তাদের গিনিপিগ হচ্ছে বাংলাদেশ। কেননা, শ্রীলঙ্কা, নেপালে বামপন্থী সরকার থাকায় আরএসএস মতাদর্শের ভারত সরকার হালে পানি পাচ্ছে না। আবার মালদ্বীপ, ভুটানের মতো দেশে আপাত দেশপ্রিমক সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করে ভারতের দাদাগিরিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশেও জুলাই অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ কলোনিয়াল লেগাসির ভারতীয় দাদাগিরিকে জনগণ পিষে দিয়েছিলো। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সার্কাস এই সুযোগ পুরানো মৌলবাদ আর নাবালক মৌলবাদের বাড়বাড়ন্ত ঘটিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যেই সফল করার পথ নিচ্ছে। কেননা তারা সবই তো হান্ডিংটন সাহেবের নানা কায়দার মুরিদ। এখন সংস্কারের বুলশিট মুলা ঝুলিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানকে দীর্ঘসূত্রিতার খেলায় ফেলতে চাচ্ছে। এই সুযোগে ইউসুফ সরকার এখানে হান্ডিংটন সাহবের চাহিদা মোতাবেক মুসলিম মৌলবাদের জমিনকে শক্ত করছে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতকে তিড়িংবিড়িং করে লাফানোর সুযোগ দিচ্ছে। জনগণকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে, স্বৈরতন্ত্রের লুটপাট করে যাওয়া অর্থনীতিকে আরও মুমূর্ষু করছে, জঙ্গলের মবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে, নারিদের প্রধান টার্গেট করে চরম নিপীড়নের দরজা খুলে দিচ্ছে। এই সুযোগে ভারতের বিজেপির দাদারা তাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা আর বহুত্ববাদের বেসিকসকে তছনছ করতে চাইছে। তাদের এই খেলা বহুত আগে থেকে শুরু হলেও এখন তীব্র হচ্ছে। আর হিন্দুত্ববাদকে আরও মজবুত করতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক থিওডোর এ্যাডার্নোর কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির তত্ত্ব মোতাবেক সিনেমাকে প্রোপাগাণ্ডার হেজিমনি টুলস হিসেবে ব্যবহার করছে। আওরঙ্গজেবের কবর সরানোর হিন্দুত্ববাদী মব উসকে দিতে শিবাজিকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র টনিক হিসেবে কাজ করেছে। হান্ডিংটন সাহেব আর তার হোমরাচামরা চেলারা এখন তাদের খেলার মোক্ষম জায়গা হিসেবে ভারত বাংলাদশেকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে মনে হয়…